শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে বড়সড় ধস নামল মূল্যবান ধাতুতে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ফেডারেল রিজার্ভের মধ্যে আপাতত আর কোনও সংঘাতের সম্ভাবনা নেই—এই ধারণা থেকেই বিনিয়োগকারীরা দ্রুত লাভ তুলে নিতে শুরু করেন। তার ফলেই সোনা, রুপো সহ গোটা প্রেশাস মেটালস বাজারে তীব্র পতন দেখা যায়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মার্কিন ফেডের স্বাধীনতা নিয়ে অনিশ্চয়তার জেরে বিনিয়োগকারীরা মুদ্রা ও বন্ড থেকে সরে এসে সোনার দিকে ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প যখন কেভিন ওয়ার্শকে নতুন ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করেন, তখন সেই আশঙ্কা অনেকটাই কমে যায়। এর পরই বিশ্ববাজারে সোনা–রুপোর দাম ঠান্ডা হতে শুরু করে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে রুপো। শুক্রবার রুপোর দাম একদিনেই ১৮ শতাংশের বেশি কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে গোল্ড ও সিলভার ইটিএফে। দীর্ঘ সময়ের টানা ঊর্ধ্বগতির পরে লাভ তুলতে বিনিয়োগকারীরা হুড়োহুড়ি শুরু করায় গোল্ড ইটিএফ ৯–১২ শতাংশ এবং সিলভার ইটিএফ ১৮–২৩ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়।
ভারতীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিট নাগাদ আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম নেমে আসে প্রতি আউন্সে ৫,০০৮ ডলারে। কমেক্সে এপ্রিলের গোল্ড ফিউচার্স লেনদেন হয় ৫,০২৭.৮১ ডলারে, যা একসময় ১০ শতাংশেরও বেশি নীচে নেমে গিয়েছিল। মুম্বইয়ের স্পট মার্কেটে ১০ গ্রাম সোনার দাম কমে দাঁড়ায় ১,৬৫,৭৯৫ টাকায়, আগের দিনের ১,৭৫,৩৪০ টাকা থেকে অনেকটাই কম। এমসিএক্সে এপ্রিলের গোল্ড ফিউচার্স বৃহস্পতিবারের তুলনায় ৮ শতাংশের বেশি কমে ১,৬৮,৯৩৮ টাকায় দাঁড়ায়।
রুপোর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। গত কয়েক মাসে ‘সোনালি সময়’ কাটানো এই ধাতুর দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ১০০ ডলারের নীচে নেমে আসে—প্রতি আউন্সে ৯৮.৯৩ ডলার। কমেক্সে মার্চের রুপো ফিউচার্স ছিল ৯৮.৫৮ ডলারে। মুম্বই বাজারে প্রতি কেজি রুপোর দাম একদিনে প্রায় ৪৬ হাজার টাকা পড়ে ৩,৩৯,৩৫০ টাকায় নেমে যায়। এমসিএক্সে মার্চ চুক্তিতে রুপোর দর দাঁড়ায় ৩,৩৭,৯৪৫ টাকা।
এই পতনের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায় ইটিএফ বাজারেও। নিপ্পন ইন্ডিয়া, এইচডিএফসি ও ডিএসপি মিউচুয়াল ফান্ডের গোল্ড ইটিএফ ১০–১৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। অন্যদিকে নিপ্পন ইন্ডিয়া, আদিত্য বিড়লা সান লাইফ ও আইসিআইসিআই প্রুডেনশিয়ালের সিলভার ইটিএফে ১৮–২০ শতাংশ পতন হয়।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা গোল্ড ইটিএফে প্রায় ৪.৩৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন এবং এই তহবিলগুলির হোল্ডিং বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। বর্তমানে গোল্ড ইটিএফের মোট অ্যাসেট আন্ডার ম্যানেজমেন্ট প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার। উল্লেখযোগ্যভাবে, চলতি সপ্তাহের শুরুতেই সোনার দাম রেকর্ড ৫,৬০০ ডলার এবং রুপোর দাম ১১৮ ডলার প্রতি আউন্সে পৌঁছেছিল।
অগমন্টের রিসার্চ হেড ড. রেনিশা চেনানি জানিয়েছেন, শক্তিশালী ডলার, মার্জিন চাপ এবং উচ্চ স্তরে ব্যাপক লাভ তোলার কারণেই সোনা ও রুপোর দাম আচমকা পড়ে গিয়েছে।
রিদ্ধিসিদ্ধি বুলিয়নসের এমডি এবং ইন্ডিয়া বুলিয়ন অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পৃথ্বীরাজ কোঠারি জানান, এই সংশোধন সত্ত্বেও চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত সোনা প্রায় ২৫ শতাংশ এবং রুপো প্রায় ৪৫ শতাংশ উপরে রয়েছে। বহু রেকর্ড গড়ার পরেও ১৯৯৯ সালের পর এটিই তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী মাসিক পারফরম্যান্স হতে চলেছে বলে তিনি মনে করেন।
কোটাক মিউচুয়াল ফান্ডের ফান্ড ম্যানেজার সতীশ ডোন্ডাপাটির মতে, ডলারের শক্তি বৃদ্ধি এই দরপতনের অন্যতম প্রধান কারণ। অন্যদিকে চয়েস ওয়েলথের সিইও নিকুঞ্জ সরাফ জানান, ট্রাম্পের অধীনে কঠোর মনোভাবাপন্ন ফেড চেয়ারম্যান মনোনয়ন পাওয়ায় ডলার আরও শক্তিশালী হয়েছে, যার জেরে অতিরিক্ত চড়া দামে থাকা ধাতুগুলি বড় ধাক্কা খেয়েছে।
এছাড়া প্ল্যাটিনাম গ্রুপের ধাতুগুলিও রেহাই পায়নি। প্ল্যাটিনামের দাম ১২ শতাংশের বেশি পড়ে প্রতি আউন্সে ২,২৮৮.২০ ডলারে এবং প্যালাডিয়ামের দর প্রায় ১০ শতাংশ কমে ১,৮২৭.৫০ ডলারে নেমে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের ধৈর্য পরীক্ষা করছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা থাকায় সোনা ও রুপোর মৌলিক ভিত এখনও মজবুত—এমনটাই মত বাজার বিশেষজ্ঞদের।