কলকাতা:
হঠাৎ কীভাবে আকাশেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভেঙে পড়ল অজিত পাওয়ারের বিমান—এই প্রশ্নেই এখন তোলপাড় রাজনৈতিক মহল। যান্ত্রিক ত্রুটি, পাইলটের ভুল না কি নাশকতার সম্ভাবনা—সব দিক নিয়েই জল্পনা তুঙ্গে। এই আবহেই মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী ও এনসিপি নেতা অজিত পাওয়ারের মৃত্যু নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মমতা বলেন, “আমি জানি না আগামী দিনে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের ভাগ্যে কী লেখা আছে। কয়েকদিন আগেই সোশাল মিডিয়ায় দেখেছিলাম, অন্য একটি রাজনৈতিক দলের এক নেতা বলছেন—অজিত পাওয়ার বিজেপি ছেড়ে দিতে পারেন। তার পরেই আজ এই ঘটনা ঘটল।” মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য ঘিরেই শুরু হয় তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর।
তবে অজিত পাওয়ারের কাকা এবং এনসিপির প্রাক্তন সভাপতি শরদ পাওয়ার স্পষ্ট ভাষায় সমস্ত রাজনৈতিক ইঙ্গিত খারিজ করে দেন। তিনি বলেন, “এই দুর্ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক। এমন ক্ষতি কোনওদিন পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু এই ঘটনার পিছনে রাজনীতি খোঁজার চেষ্টা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কিছু দুষ্টচক্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই ধরনের তত্ত্ব ছড়াচ্ছে। এটা নিছকই একটি দুর্ঘটনা।”
শরদ পাওয়ারের বক্তব্যকে সামনে রেখেই মমতার মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশ। তিনি বলেন, “এই ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। শরদ পাওয়ারজি নিজেই পরিষ্কার করে বলেছেন, এটি একটি দুর্ঘটনা। এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন মন্তব্য করা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও নিম্নমানের রাজনীতির পরিচয়। এই ধরনের বক্তব্য একেবারেই অনুচিত।”
তবে বিতর্কের মধ্যেও নিজের অবস্থানে অনড় মমতা। তিনি সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি একমাত্র সুপ্রিম কোর্টের ওপরই ভরসা রাখতে পারি। অন্য কোনও তদন্তকারী সংস্থার ওপর আর বিশ্বাস নেই। আজ হয়তো উনি বিরোধী শিবিরে ছিলেন, কিন্তু আগামী দিনে পুরনো দলে ফেরার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছিল।”
এদিকে কেন্দ্রীয় রেল প্রতিমন্ত্রী ও রাজ্যসভার সাংসদ রভনীত সিং বিট্টু কড়া ভাষায় মমতার মন্তব্যের নিন্দা করে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন ভোটের জন্যই উনি এমন মন্তব্য করছেন। এটা পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
অন্যদিকে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি-সহ বিরোধী দলগুলিও দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তুলেছে। রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, “এটা স্বাভাবিক দুর্ঘটনা বলেই মনে হচ্ছে না। ছোট বিমান হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে এমন দুর্ঘটনা ঘটল, তার বিস্তারিত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, কাকা শরদ পাওয়ারের হাত ধরেই রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন অজিত পাওয়ার। পরবর্তীকালে দল ভেঙে এনসিপির নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নেন এবং বিজেপির সঙ্গে জোট করে মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী হন। তবে সাম্প্রতিক পুরভোটে বিজেপির সঙ্গে জোট না বেঁধে ফের শরদ পাওয়ার শিবিরের সঙ্গে হাত মেলান তিনি। সেই থেকেই কাকার সঙ্গে দূরত্ব কমার জল্পনা জোরদার হয়েছিল।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান অজিত পাওয়ার। মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পরই বারামতিতে পৌঁছন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশ এবং উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে। রাজনৈতিক মহল জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে, সঙ্গে চলছে প্রশ্ন, জল্পনা ও তীব্র রাজনৈতিক তরজা।